ইরানে আবারও বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জবাবে তেহরান জানিয়েছে, যেকোনো হামলার ‘নির্ভয়ে ও সাহসিকতার সঙ্গে’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
বুধবার তুরস্কে নেটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “গত রাতে আমরা তাদের খুব কঠিনভাবে আঘাত করেছি এবং আজ রাতেও সম্ভবত কঠিন আঘাত করব।”
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে গত জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, “তারা মিথ্যা বলে এবং প্রতারণা করে।”
এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্স-এ লিখেছেন, “আমরা অভদ্রতার জবাব অভদ্রতা দিয়ে দিই না, বরং কর্ম দিয়ে দিই: নির্ভয়ে ও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে।”
চুক্তি স্বাক্ষরের পর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।
১৪ দফার ওই সমঝোতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ছিল।
নেটো সম্মেলনে চুক্তি নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয় এটা শেষ। আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করতে চাই না, তারা নিকৃষ্ট… তারা অসুস্থ মানুষের নেতৃত্বে চলে এবং তারা হিংস্র, সহিংস মানুষ।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা একটা চুক্তি করি… তারা বাইরে গিয়ে প্রেসকে বলে ‘আমরা এ নিয়ে কখনো কথাই বলিনি’। তাদের কিছু একটা সমস্যা আছে। তারা পাগল। আমার মতে, এটা শেষ।”
‘আলোচনা সময়ের অপচয়’
সম্মেলনের আগে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন আলোচকরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে, তবে তিনি এটাকে “সময়ের অপচয়” বলে মনে করেন।
তবে পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না এবং “যা কিছু ঘটবে তা দ্রুতই শেষ হবে।”
ট্রাম্পের মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন ইরানের একাধিক কর্মকর্তা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়েতি হুঁশিয়ার করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হলে “তাৎক্ষণিক জবাব” দেওয়া হবে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদী বলেন, “ট্রাম্পের মন্তব্য শক্তির পরিচয় নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে পেশিশক্তি, নিষেধাজ্ঞা ও হুমকির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি নীতির ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি, যা ইরানি জাতিকে নত করতে পারেনি।”
পাল্টাপাল্টি হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মঙ্গলবার জানায়, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি ট্যাংকারে হামলার জবাবে তারা “শক্তিশালী” হামলা চালিয়েছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস ও বুশেহরে মার্কিন হামলায় দেশটির সেনাবাহিনীর আট সদস্য নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র আরও জানায়, তারা ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে।
বুধবার ইরান জানায়, প্রতিশোধ হিসেবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তেলের দাম বেড়ে যায়, যদিও তা প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ থাকার সময়ের চেয়ে এখনও অনেক কম।
সেন্টকম বুধবার জানায়, ২০টিরও বেশি মার্কিন নৌযান মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় টহল দিচ্ছে।
নেটো প্রধানের সমর্থন
নেটো প্রধান মার্ক রুটে মার্কিন হামলাকে “একেবারেই প্রয়োজনীয়” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ইরান “মূলত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।”
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান আলোচকও, তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞাসহ সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন। মার্কিন হামলার পর তিনি বলেন, “গুন্ডামি ও চাঁদাবাজির যুগ শেষ। এর কোনো পরিণতি নেই। আমরা নতি স্বীকার করি না।”
চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
গত মাসে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে বেশ কয়েকবার গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ২৬ জুন হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজে ইরানি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানে একাধিক হামলা চালায়। ২৭ জুন একটি ট্যাংকারে হামলার পরও আরও মার্কিন হামলা হয়। তবে ওই মাসের শেষের দিকে দুই পক্ষই “সংযত” থাকতে সম্মত হয়।
সমঝোতার ১৪ দফার মধ্যে ছিল “সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযানের অবিলম্বে ও স্থায়ী সমাপ্তি”। ইরান ৬০ দিনের জন্য “বাণিজ্যিক জাহাজের বিনামূল্যে নিরাপদ চলাচলের” জন্য “সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা” চালাতে সম্মত হয়েছিল।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম দিনে নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার কারণে আলোচনা স্থগিত ছিল। বুধবার ইরাকে তাঁর শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান চলছে, বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদে তাঁকে দাফন করা হবে।
সর্বশেষ হামলার পর আলোচনা কবে শুরু হবে তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, “আমার কিছু যায় আসে না।”
তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, আমি তাদের সঙ্গে সময় নষ্ট করতে চাই না। এখন, আমাদের চমৎকার আলোচকরা চাইলে কথা চালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আমি এটাকে সময়ের অপচয় মনে করি।”
ট্রাম্প তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের কথা উল্লেখ করে বলেন, তারা “ভালো মানুষ” এবং চাইলে আলোচনা করতে পারেন। এই দুজন এর আগে শান্তি আলোচনায় ভূমিকা রেখেছিলেন।
“আমি আমাদের আলোচকদের সঙ্গে কথা বলব, তারা যদি আলোচনা করতে চায় তারা ভালো মানুষ - স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার - কিন্তু তাদের আমার কাছে ফিরে আসতে হবে। আমার মতে এটা শুধুই সময়ের অপচয়।”
মন্তব্য করুন