[১ম খণ্ড]
এক-নয়-নয়-এক,
যাহারে কহিছিনু- ভুলিও মোরে চিরতরে, স্বর্গ যদি কভু মম চিত্তে নাড়ে!
ভুলিবো ভুলিবো কহিয়া ভুলেও তবু পারিনু না ভুলিতে আজও তাহারে৷
বেদনার তরঙ্গ বহিল ধ্যানে-
নিগূঢ় সম্বন্ধখানা ফের স্মরিনু হৃদয়ের গহীনে!
হেরেছিনু যবে প্রেমের স্বপনে-
সুখানুভবে ভরা যাবিত কূলহীন দিবস রজনীর হেলা মোরে যতবারে স্মরে ততোধিক অতলে হানে৷
এক হাজার নয়শত একানব্বই- ইহা কভু ভুলিবার নহে!
পূজোর পুঁজি বত্রিশ সাল মোর পুড়িলো বেদনাময়ী অগ্নিশিখার বানে!
সালের দিগন্তে নব পূর্ণিমার বর্ষায় ভিজেছিনু যবে প্রেমে,
ওহি ভেজা প্রেমখানা শুখানু খুনসুটির পীড়ায় অনুচিত সন্দেহে!
পূজোর পুঁজি সুখের থলিতে কি লভিলো আর কি লভিনু দু’জনে,
তৎক্ষণাৎ কালের অঙ্ক কষি- প্রেমের সমুদ্রে বেদনার জহর ঢেলেছিনু মোরা গুনে গুনে৷
সম্ভবত সেদিন অর্ধ দিবসে সূর্যগ্রহণ ছুঁয়েছিল ভূ-মণ্ডলে!
তবো নহে, তবুও অনুভবে তপ্ত রোদ্দুরে চিলের বেশে মোরা পাড়ি দিয়েছিনু দুই দুটো বিদিত পৌরপুঞ্জে৷
জেনেছিনু ক্ষেত্র দ্বয়ের নামধাম,
তবো ক্ষোভ পুষিয়া কহি নাই কেহ বিদিত পৌরপুঞ্জ অবধির শিরোনাম৷
হঠাৎ হৃদয়ের কুঠিরে ফের জাগিলো মোর স্বাদ-
স্মৃতির বারিধারায় আরও খানিক দুখ্ ধৌত করিতে টানিলো নরকের কাঁধ৷
পথের দুরত্বখানি বহুদূরে,
তবো পথযাত্রায় কভুও স্মরি নাই বিষাদিত ক্লান্তির তীরে৷
দুখের বোঝখানা ভরা তরীতে তুলিয়া ঘুণের বৈঠা বাইনু আজও সেথাকায় উন্মাদ মগ্নে,
ফিরে ফিরে চাহি- প্রকৃতির দৃশ্য নয়নে সবি ভুলিনু যতনে৷
রেলের দুইধারে মটরশুটি আর সোনালী ফুলগুলি দুলছিল দখিনা হাওয়ায়,
তাই দেখে হাসি মনে দ্রুতগামী পৌঁছেনু মধুমতি রেলস্টেশনের প্রান্তসীমায়৷
চরণ দুখানি ছুঁতেই দেখিনু,
নধর মুখশ্রী মধ্য বয়সী একাকিনী এক নারীর তনু-
দেখিনু, শ্যামলা গালখানা হাতের তালুতে রাখিয়াছে ঠেলে,
মৃদু হাওয়ায় ঘোমটাখানা তাহার খোপার অধভাগে নড়িতেছে ঝুলে ঝুলে৷
দেখিনু তাহারে-
কুরসিতে বসিয়া পলক দু’খানি টানি টানি কাহারে যেন খুঁজিতেছে ফিরে ফিরে৷
অতঃপর দেখিনু হেলে, এ-তো কেহ নহে,
এ-তো হেরেছিনু যবে ওহি মোর প্রেয়সী ধ্যানরতে!
হায়, অকারণে কত সাল বৃথা দাহ ভুগি-
ভাগীর ভাগ্য ললাটে সহসা দৃশ্য আঁকিলো- চেনা সেই মন ময়ূরীর প্রতিচ্ছবি৷
অশ্রুশিক্ত নয়নে এক পলক চাহি- বিষম আনমনে ভাবিনু,
কালের গহীনে, সে বুঝি মোরে আমি বুঝি উহারে- চাহিবার তরে না জানি দু’জন দু’জনে অলিগলি পথে কতবার খুঁজেছিনু!
নচেৎ, দু’জনের আত্মা বাহক এমনি মুহূর্তে কহিতেছে সনে-
মোরা দু’জনে কেহই বুঝি কাহারেও খুঁজিনি কভু ক্ষনে!
ভাবিনু কল্পে ইহা বুঝি সৃষ্টিকর্তারই অসীম মহিমার কারবার হইতে পারে
নহে তবো হেরেছিনু যবে সেই বত্রিশ সাল- এতকাল পরে কেমনে ফের ফিরে পেনু যথা নবাগত শনিবারে?
দিবস তারিখখানাও অনুরূপ ওহি,
যেথায় নাহি শুধু টক-ঝাল আর মিষ্টি মধুকরী মুখো-কাব্যের উর্বশী!
সদা সত্য ধৈর্যের বলিদানে ইহাই বুঝি সৃষ্টিকর্তা মোরে সঁপিয়েছেন সৌভাগ্যে অলৌকিক রতি,
নহে তবো কহ…কহ কেহ এত সাল পরে-
তাহারই সহিত কেমনে ফের সাক্ষাৎ হইল মোর যথারীতি?
রচনাকাল: ১৯-০৩-২০২৩ইং৷
[২য় খণ্ড]
কোথাও যাত্রা করেছিনু ভেবে-
তুমি রহিয়াছিলে ট্রেনের অপেক্ষায় বসি,
আর আমি ছিলুম দাঁড়িয়ে হস্ত দু’খানি পাঁজরের নিচে বাঁধি৷
দু’জনেই মোরা ছিলুম অতি কাছাকাছি,
তবু্ পূর্বের ন্যায় কেহই কাহারো প্রতি একনজরও দেখিনু না ফিরি!
বরং কামনাময়ী যাত্রার ট্রেনখানা ফিরাবার হতাশায় দু’জনেই মোরা একই দিকে রহিয়াছিনু চাহি৷
যবে একবার দেখিলে হঠাৎ ঘাড়খানা হেলি-
তবো চিনেছিলে কিনা মোরে সেও ঠিক জানিতুম না অধরা কল্প মেলি!
কেমনে হারিনু সখের অতটা সাল কখন কবে?
তাহাই স্মরি, তবো চিনিবে আর কেমনে কহে মোর ক্লান্ত হৃদয়ে চুপে!
ইদানীং চক্ষুদ্বয়ের দৃষ্টিশক্তি খানাটাও মোর গিয়াছে কমে,
কখনো সখনো পথ চলিতে চলিতে হোঁচট খেয়ে প্রায়ই পড়িয়া রই পথেরেই মধ্যখানে,
আজি যাহাই দেখিতে পায় চক্ষুদ্বয় সমগ্র বিশ্ব জগৎতে-
সেও জানিও তোমারি দেয়া পুরোনো এহি মোর চশমাখানার বদলে৷
যে চশমাখানা কোন একদিন তুমিই মোরে নিজ হাতে পরিয়েছিলে চক্ষুদ্বয়ে!
অথচ যাহার বদৌলতে ক্ষণে তোমারে পেরেছিনু না ক্ষুদ্র কোন কিছু দিতে!
যবে মিলনের বেলায় অঘোর খুনসুটির ধারায় যাহারে কহিতে তুমি রাগের ফণা ধরে- “তুমি বড়ো পাষণ্ড ওহে!”
স্মরিয়া উক্ত পদবী, ভাবিয়া সত্যি মানিনু নিজেরে আজি পাষণ্ড লোভী ব্যক্তির বেশে৷
যে কিনা সময়ের নিক্তিতে শুধু শুধু নিজেকেই চিনে মাপিত মায়ার যতনে,
যে কিনা ক্ষণেই চিনিতে পারিত না প্রিয়তমা তোমারে,
যাহারে তুমিও বুঝোনি কভু- যে হৃদয়ের ভাষা, তোমারি হৃদয় তুল্যরূপে!
প্রিয়তমা, যদি কভু মোরে একনজর দেখিতে চাহি?
আগেকার মতো নাহি মোর আজ আর তেমনি মুখশ্রী,
পুষ্ট চামড়াগুলো শুকিয়া এখন ঘোঁজের ভাজে দুর্গন্ধময় পলি এঁটেছে,
আর্মি স্টাইলে ছাঁটা মাথার কৃষ্ণ-কালো চুল ও উজ্জ্বল মুখখানির খোঁচাখোঁচা দাড়িগুলো-
এখন সেগুলি সাদা হইয়া যেমন, বৃদ্ধ বয়সী কবি রবী ঠাকুরের মতনেই ঠিক বুকের শুকনো পাঁজরগুলিকে মোর ছুঁইছে,
শুধু তোমারি দেয়া চোখের সেই চশমাখানা- আজও তাহা আগেরই মতন রহিয়াছে,
যে চশমাখানা কোন একদিন তুমিই মোর চক্ষুদ্বয়ে নিজ হাতে পরিয়েছিলে!
প্রিয়তমা, যদি একটিবার দেখিতে চাহিয়া মোরে-
তবো সেকালের সকল কথা সকল স্মৃতি জাগিত তোমারি হৃদয় অতলে!
রচনাকাল: ০২-০৬-২০২৩ইং৷
[৩য় খণ্ড]
ইতিপূর্বে অতীতে আর যাহাই রচেছিনু, সবি মোর অসহায় জীবনের আবেগী অনুতপ্ত মাফিক স্বরিনু,
যাহার অনুভূতি শুধু শুধু অবুঝ অন্তরের অন্তর্যামীরে খানিক মাত্র শুধানু.!
আর যাহাই কাঙ্গালে কহেছিনু, সাক্ষাৎ ক্ষণে তোমারে ফের এটুকুই কহিবার লোভীনু-
তুমি মোরে চিনিছ কিবা নাহি চিনেছ প্রিয়,
তোমারে তবো তিল-টুকুও চিনিবার অনুধাবন- গহীনে মোর নাহি গেঁথেছিনু!
চলিতে ফিরিতে দিবানিশি নয়ন গহ্বরে-
যে ছবিখানাই যবে ভাসিতো কিনারে,
ওহি সেই রূপের ঝলক’ কতকাল পরে তাতিলো দিশেহারা সজলে;
অতীতে আর যাহাই দেখেছিনু প্রিয়া, যেনো তাহাই দেখিনু আজও অবিকল তোমারে;
তবো, উনিশের ওহি সবল তারুণ্যের বাহার শুধু শুধু হারিনু স্বীয় দোষের দোসরে.!
হারাবে নহে তো কী.?
তুমি তো বায়ান্নটারে ছুঁইছো সবেমাত্র.!
আর আমি.?
সে তবো তোমারে নাহি গুনিয়া কহিনু.! বিরহ্ নিক্তির পাত্র দু’খানায় যাহাই ঝরিয়াছিনু যথা সাধ্যের অশ্রু,
ওটুকুই তুলিয়া তাহাতে- বুঝিয়া লইও প্রিয়া অনুমানে-
তুমি আমি দু’জনেই বটে বছর ত্রিশেক পেরিনু মিছে অভিমানে.!
রচনাকাল: ০৩-১১-২০২৪ইং।
[৪র্থ খণ্ড]
এমুনি ভাবনাময়ী কথার অনুভবে ডুবি- তথাপি ওভাবই রয়েছিনু দাঁড়িয়ে;
হঠাৎ কুরসি হইতে উঠিয়া অচেনার আবেশে কদমে কদমে তুমি- মোর পাশে আসিয়া দাঁড়াইলে।
গম্ভীর স্বরে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করিলে পরে-
“জনাব, ক্ষমা করিবেন অধীর’রে…”
আজ্ঞে বলুন তো- বকুল তলা পাড়ি দেবার ট্রেনখানা রহিয়াছে আরো কতদূরে?
বকুল তলার কথাখানা শুনিতেই ভীষণ আঁতকে উঠিনু৷
যেথায় মোর দেহ মন দুটোই রহিত পড়িয়া কাতরে, যাহার কূলে হরহামেশাই ছুটিতুম এই ভবঘুরে,
তথা কুলে ফিরিবার সখে আজও যে কিনা যাত্রায় এসেছিনু সবি ছেড়ে.!
ওহি সেই বকুল তলার কথাখানা অপর কাহারো মুখে শুনিলে পরে…
কেহ কী রহিয়াছ কহ- কাহারে সুধাইবো?
‘মীড় হইয়া আসিয়া যে কড়া নাড়ে মোর অনুভবের দুয়ারে!’
রচনাকাল: ০২-০৪-২০২৬ইং।
[৫ম খণ্ড]
মিছেমিছি আপন মনেরে জিজ্ঞেসিনু,
“আচ্ছা আমিও তো ওহি বকুল তলারই যাত্রী, তবো কী বুঝিবো- নীলাও তাহার ঘরকন্নায় পতি ছাওদের লইয়া সুখের জলকূলে ভাসিতেছে?
ছি…ছি…তাহা কেন হইবে? আনমনে ইহা তবো ভাবিনু কিসে?
যদি তাহাই বাঁধিয়া রহে- তবো ওসবের মায়া ত্যাগ করিয়া মধুমতি এলাকায় এসেছিল সে কাহার টানে?
ওহি সেই বকুল তলা রেলস্টেশন? যেথা হইতে মোরা দু’জনে প্রেমের বীজ বুনেছিনু মধুর যতনে?
যেথায় রহিয়াছিল বিশাল একখানা বকুল গাছ?
যে গাছ তলার আধো ছায়ায় বসিয়া বসন্তের শীতলা হাওয়ায় ফুলের সুগন্ধে দু’জনেই মোরা ডুবেছিনু প্রেমের সাগরে?
ওহি সেই বকুল তলা?
না..না… ইহা কেমনে হইতে পারে?
যেখানটায় প্রায়শই ছুটিতুম ব্যথা দহনে?
তবো কেন কভু কোনদিন দেখিতুম না সেথায় তাহারে?
তাহলে..? কেন তবো আজিকে নীলা হঠাৎ বকুল তলায় ফিরিবার এত ব্যাকুলে?”
হঠাৎ ভাবনার কড়িডোরে কড়া নেড়ে ফের মোরে নীলা কহিল মুচকি হেসে-
“কী হইলো জনাব, নিশ্চুপ রহিলেন যে?”
নীলার প্রতিত্তরে ইতস্তত ভঙ্গিমায় গম্ভীর স্বরে বলিলুম নয়ন দুখানা কুচকিয়ে,
“আজ্ঞে জ্বী, এই তো…খানিক পরেই ট্রেনখানা ভিড়িবেন তটে!”
“হায় বাঁচিলুম তবে, অপেক্ষার সমাধি তো ঘটিবেন বটে..!
জনাব, দুঃখিত স্মরিবেন মোরে মিনতির তরে, বারংবার আপনারে বিরক্ত করেছিনু যেচে যেচে!”
(চলমান…)
রচনাকাল: ২৬-০৭-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন