কোটি টাকা থাকলেই নক্ষত্রে পাড়ি দেওয়া সম্ভব৷ কিন্তু কোটি টাকার বিনিময়ে নক্ষত্রদের সঙ্গে বসে কখনো কথোপকথন করা সম্ভব নয়৷
কিছু কিছু মানুষ স্বার্থ নিবেশে অবাঞ্ছিত সাইজের কিছু উপদেশও দিয়ে থাকেন, যার ওজনটিও তুলনাহীন ভারি৷ অথচ সেটা নিজে কখনো বহন না করে অন্যের ঘাড়ে তুলে দেন৷ আবার এমনও কিছু মানুষও আছে, তাঁরা যেমন তাদের উপদেশগুলো দিয়ে থাকেন সেগুলি তাঁরা নিজেও বহন করতে পারেন, এবং এর বদলে সামান্য একটু পরিশ্রম করতে জানলে অন্যরাও সেটা সহজে বহন করতে পারেন৷
ব্যাংক ভর্তি টাকা এবং মটকা ভর্তি খাবার খাদ্য ও ঘরে উন্নতমানের আসবাবপত্র নেই বলেই- অনুরূপ উৎস ধরে অনেকে আমায় স্বপ্ন দেখায়, কোটি টাকা বানানোর৷
স্বপ্ন দেখায়, ঐসব কোটি টাকাগুলি দ্বারা দিয়ে যেন কোনো একটি বিশাল আকারের বিলাস ভবন নির্মাণ করি৷ স্বপ্ন দেখায়, সেই বিশাল আকারের বিলাসী ভবনে থাকবে, ব্যয়বহুল জনিত নানা ডিজাইনের আসবাবপত্র৷
স্বপ্ন দেখায়, দৈনিক আমার তিনবেলা খাওয়া দাওয়ার আয়োজনে থাকবে, হরেক রকমের সুস্বাদু তরিতরকারি সহ কোরমা পোলাও৷ স্বপ্ন দেখায়, প্রিয় সঙ্গিনীটির পরনে থাকবে লাখ টাকার অধিকও কেনা বেশকিছু সুন্দর সুন্দর শাড়ি৷ হাতে, পায়ে, গলায় এবং তাহার চিকন কোমরে থাকবে, কয়েক ভরি স্বর্ণ ও মণি মুক্তোর অলঙ্কার৷
স্বপ্ন দেখায়, সন্তান সন্ততি ভবিষ্যৎতে তাঁরাও হবে আমারই মতো কোটিপতি৷ অবশ্য কিছু মানুষও আছেন, এই কোটিপতি হবার সফলতায় প্রতিনিয়তই তাঁরা এই কোটি টাকা বানানোর স্বপ্নটি দেখে থাকেন ৷ তবে সেই স্বপ্নটা কারো কারো সফল হয়, আবার কারো কারো সফলও হয় না৷
আর যাই হোক না কেনো, তেমনি এক কোটিপতি স্বপ্ন পূর্ণতা পাবার ব্যক্তিটির আশপাশে জড়িয়ে থাকেন কিছু যষ্টিমধু সম্পর্কিত মামা ও খালুরা৷ আবার এই কোটিপতি সফল না হবার স্বপ্ন অপূর্ণতায় ভুক্তভোগী ব্যক্তিটিরও আশেপাশে জড়িয়ে থাকেন তেমনি কোনো না কোনো ইত্যাদি সম্পর্কের মামা ও খালুরাই৷
অথচ যারা আমাকে এই কোটি টাকা বানানোর স্বপ্নটি দেখার নির্দেশটি দিয়েছেন, উনি এটা কখনই সুস্থ মনমানসিকতায় ভেবেচিন্তে বিপরীত দিক নির্দেশনায় সূক্ষ্মভাবে বলেও দেননি যে, এই কোটি টাকাটি বানাতে হলে এজন্য আমাকে কোন্ কোন্ কাজকর্ম গুলিকে অবলম্বন করতে হবে৷
কখনো সখনো এই কোটি টাকা বানানোর স্বপ্নের বিষয়টা আমার ধ্যানমগ্নটিকে এতটাই বিষণ্ণতায় ভাবিয়ে তোলে যে, যা কল্পনা করতে গেলেও ভীষণ অনুতপ্তে লজ্জার সম্মূখে নতশিরে থমকে দাঁড়াতে হয়৷
অনুশোচিত লজ্জার বোঝাটা মাথায় বয়ে অনেক সময় কল্পনার সীমানায় এটাও ভাবতে থাকি, এই যে আমি কোটি টাকাগুলো দ্বারা এতটাই কিছু করলাম, গড়লাম, অথচ দিনশেষে তো আমাকে ঐ একটি বিছানায় একটাই ঘুম দিতে হবে; হয়তো আমার সেই ঘুমটিও হতে পারে চূড়ান্ত ঘুম?
তাহলে এই যে আমি কোটি টাকাগুলো দ্বারা এতকিছু করলাম, তবে? তবে সেগুলি আমি কার কার জন্য করেছি? আমারই জন্ম দেওয়া প্রিয় সন্তানদের জন্য? কিন্তু তাঁরাও তো ঠিক আমারই মতো কোনো না কোনো একদিন সেই একই কল্পনাটি করতে পারে? হয়তোবা কোনো না কোনো একদিন এই একই লোভ লালসায় তাঁরাও পতিত হতে পারে?
নচেৎ আমার সন্তানরা ছাড়া তাদের প্রজন্ম? তাঁরাও তো ঐ একই রকম কোটি টাকা বানানোর প্রচেষ্টায় দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়বে? অথচ এই কোটি টাকার ভাবনাটির ক্লান্তিশেষে তাঁরাও তো একটা সময় সেই একটিমাত্র বিছানায় একটাই ঘুমে বিভোর থাকবে?
সত্য তো এটাই, একটা সুখের ঘুম কখনো সবার ভাগ্যে জোটে না৷ এবং এই একটা সুখের ঘুম দেবার জন্য অনেকেই কত ধরনের চেষ্টাটিও করে থাকেন৷ অথচ সেই কামনাকৃত ঘুমটিও যে তাঁর সুখের ঘুম হবে কিনা সেটাও তিনি তখন ভুলে যান৷
অনেকেই এই পৃথিবীটাকে অসমাপ্তি এক দুখের ভাণ্ডার মনে করে থাকেন৷ কেউ কেউ আবার এই পৃথিবীটাকেই চিরস্থায়ী সুখের স্থানটিও মনে করেন৷ তবে যারা এই পৃথিবীটাকে দুখের ভাণ্ডার সমতুল্যে উপলব্ধি করে থাকেন, সত্যিকার্থে তাঁরাই হয়তো একদিন এই দুখের পৃথিবীটাকে ছেড়ে চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারেন৷
আকাশ ও জমিনে আর যাহাই কিছু প্রকাশ্যে এবং গোপনে রয়েছে সেগুলির প্রত্যেকটির সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই একজন রয়েছেন৷ আর যারা এই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী ও তাঁরই দিক নির্দেশনার উপর ভরসা করে চলাফেরা করেন এবং যারা তাঁর নির্দেশে সৎ কর্মের মারফতে উপার্জন করে থাকেন তাঁরা কখনো কোটিপতি হবার স্বপ্নটিও দেখার আকাঙ্খা করেন না৷
তবে তাঁরা শুধু একটাই স্বপ্ন দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনেন, যেমন যেভাবে উপার্জন করলে নিজে ও পরিবারের সকল সদস্যরা মিলেমিশে দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পারা যায়৷ এবং এটা সত্ত্বেও যদি তাদের কাছে অবশিষ্ট সামান্য কিছু টাকা পয়সা থেকেও যায়, তবে তাঁরা সেই উদ্বৃত্ত টাকা পয়সা গুলো উপযুক্ত কোনো একটি সৎ কাজকর্মে ব্যয় করার জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠে পড়েন৷
কোটি টাকার প্রসঙ্গের এই কথাটি ভাবতে গেলেই আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় মন মাতানো আমার প্রিয় সেই দেশটিকে ছেড়ে বাহির দেশে বসবাস করার মূল উদ্দেশ্যটিকে৷ এখানে বাহির দেশটির অর্থে আমি যা বুঝি তা হলো পরদেশ৷ আর সেই পরটাই যে কখনো কোনো একদিন আপনও হতে পারে সেটিও অনেকের সৌভাগ্যের বিষয়৷
পরদেশ থেকেই উম্মোচিত করা হয়েছে প্রবাস শব্দটির সূত্রপাত৷ আর এই প্রবাসেই যারা জীবন যাপন অতিবাহিত করেন তাদের একেকজনকে বলা হয় প্রবাসী৷ আর যে যাই হোক না কেনো- এই প্রবাস জীবনটা এতটাই কষ্টকর, সেটা শুধুমাত্র তাঁরাই বুঝতে পারেন যারা ইতিপূর্বে কখনো প্রবাসে বসবাস করেছিলেন এবং বর্তমানে যারা এখনও বসবাস করছেন৷
এই প্রবাসীরাই কোনো একটা দিন তাদের আপন বাবা মা ভাই বোন ও স্ত্রী সন্তান এবং প্রিয় দেশটিকে ছেড়ে অন্য আরেকটি দেশে এসে বছরের পর বছর অতিবাহিত করছেন, তা যে কতটাই কষ্টকর সেটাও তাঁরা মনখুলে কখনো কারো নিকট প্রকাশ করতে পারেন না৷
শুনলে হয়তো অনেকেই আশ্চর্যান্বিত হবেন, পৃথিবীর বুকে কোথাও যদি সর্বোচ্চ শাস্তিদায়ক কোনো একটি জেলখানা থেকে থাকে, তবে আমার জানা মতে আমি বলবো, সেই জেলখানাটিই হলো, প্রবাসে বসবাসরত প্রবাসীদের জীবনটি৷
এমন একটি বদ্ধ কারাগারে বসবাস করার পরেও যেখানে অনেক সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রবাসীদের জীবনে হঠাৎ করে ভেসে আসা নানা রকমের দুঃখ দুর্দশাগুলিও তাদেরকে ভোগ করতে হয়৷ এছাড়াও প্রায় সময়ই এটিও তাদেরকে দূরীকরণ করতে হয়, তাঁরই পরিবারটির সকল সদস্যদের লাগাতার অভাব অনটনের চাহিদাগুলিকেও৷
অনেকে অবশ্য এটাও কখনো শোনেন নি যে, প্রত্যেকটি প্রবাসী ব্যক্তিদের একেকটি দিন অতিবাহিত হয়ে থাকে বছর সমতুল্যে৷ আর রাত্রিগুলি যে কখন কিভাবে তাঁরা অতিবাহিত করে থাকেন, সে কথাটিও যদি কেউ না কেউ কখনো জানতেন বা শুনতেন তবে তাঁরাও সেই প্রবাসীদের কষ্টগুলির শোকে অমনি দু’চোখের কোণা বেয়ে টপটপ করে লবণাক্ত জলগুলো ঝেড়ে ফেলতেন৷
সব কান্নার জল প্রকৃত কান্নার জল নয়৷ কিছু কান্নার জলে মিশে থাকে চাহিদা পূর্ণ করার৷ এবং কিছু কান্নার জলে মিশে থাকে হারানো বেদনার৷
এখানে একেকজন প্রবাসী ব্যক্তিদের বসবাসরত জীবনের সম্পর্কে সামান্য কিছু উদাহরণ স্বরূপ বিস্তারিত বিষয়গুলি যদি নাও তুলে ধরি, তবে হয়তো অনেকেই তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন না যে, আসলে এই প্রবাসীরা কখন কিভাবে এবং কতভাবে তাঁরা তাদের দুঃখ কষ্টগুলি খুব সহজেই তা সহ্য করে থাকেন৷ কিছু দুঃখ কষ্ট আছে যা নিরুপায়ে সহ্য করে নিতে হয়৷
আর যাই বলি না কেনো, এরই বিপরীত প্রসঙ্গে এই মুহূর্তে কোনো একজন প্রবাসীর জীবন কাহিনীটির কথাটি মনে পড়ে গেল৷ আমার রুমের পিছনে বদ্ধ একটি গলি রয়েছে৷ সেখানে পুরোনো একটি চেয়ারে বসে মাঝেমধ্যেই ঐ প্রবাসী ব্যক্তিটি তিনি তাঁর দেশে আপনজনদের সঙ্গে ফোনযোগে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা গুলো বলে থাকেন৷
ফোনের ঐসব কথাবার্তা গুলো মাঝেমধ্যে আমিও তা মনোযোগ সহকারে শুনতাম৷ প্রবাসী ব্যক্তিটির সেইসব কথাবার্তা গুলো শোনার পর অনেক সময় আমি নিজেও দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস বোধ করতাম৷ একেকজন প্রবাসী ব্যক্তিরা অতি সহজেই যে মিথ্যে বানোয়াট কথাগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে আপনজনদেরকে বলতে পারেন, সে কথাটি ভাবতে গেলেও কল্পনা করা যায় না৷
যাকে কিনা আমি দেখেছিলাম, সেদিন সন্ধ্যাবেলা তিনি তাঁর ডেউটি সেরে অন্য আরেকজন প্রবাসী বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে তা দ্বারা তিনি মুদি দোকানে গিয়ে যেখান থেকে কয়েক কেজি চাউল ও আলু ডাল কিনে হাতে করে এনেছিলেন, অথচ তিনিই কিনা সেদিন রাত্রিবেলা বদ্ধ গলির চেয়ারে বসে ফোনের এপাশ থেকে তাঁরই আপনজনদের কাছে বলছেন, “তোমরা কোনরকম টেনশন করো না তো- ইনশাহ্ আল্লাহ্ দেখো আর মাত্র কয়েকটা দিন পরই আমি বেতন পাবো, বেতনটা হাতে পেলেই তোমাদের খরচ বাবদ ২৫-হাজার টাকা আমি পাঠিয়ে দিবো৷”
ফোনের ওপাশ থেকে তাঁর সেই আপনজনেরা তখন তাকে কি কি বলেছিলেন তা আর শোনা যায়নি৷ তবে আমি সেই প্রবাসী ব্যক্তির কথা গুলোর জবাব দেবার ভাবভঙ্গিমাটি দেখে এতটুকুই বুঝতে পেরেছি যে, সে অতি শীঘ্রই বাড়িতে ২৫-হাজার টাকা পাঠাবে একথাটি জানতে পেরে সেদিন হয়তো তাঁর আপনজনেরা অত্যন্তই খুশি হয়েছিলেন৷
অথচ আমি যা জানতাম, তা হলো সেই প্রবাসী ব্যক্তিটি তিনি তাঁর কোম্পানিতে ডেউটি বাবদ প্রতি মাসে বেতন পান মাত্র ৩০-হাজার টাকা৷ আর সেই ৩০-হাজার টাকার বেতনটি থেকে যখন তিনি তাঁর বাড়ির যাবতীয় সাংসারিক খরচ বাবদের জন্য ২৫-হাজার টাকা পাঠিয়ে দিতে চাইছেন, তবে এ ব্যাপারে আপনারাই একটিবার ভেবে দেখে বলুন তো, বাকি আর মাত্র ০৫-হাজার টাকা দ্বারা এই প্রবাস জীবনে কিভাবে তিনি পরবর্তীয় পুরোটা মাস নিজের খাওয়া দাওয়ার খরচটা চালিয়ে নিতে পারেন?
হ্যাঁ ০৫-হাজার টাকা দিয়ে চলাফেরা করাটিও সম্ভব, তবে সেটা অন্যান্য কিছু দেশ রয়েছে সেইসব দেশগুলির জন্য খরচ চালানো তা সম্ভব৷ কিন্তু এমনও কিছু দেশ রয়েছে যেখানে তাঁর পরিবারের প্রতি মাসে যা সাংসারিক খরচ হয়ে থাকে তার তুলনায় প্রবাসে তার নিজেরই খাওয়া দাওয়ার খরচটা দ্বিগুণ হয়ে থাকে৷
এমবস্থায় একটা সময় ভিতরের কষ্টগুলোর পরিস্থিতির উপর দাঁড়িয়ে তিনি তখন নিজেই গোপনে গোপনে কাঁদেন৷ ঐসব দুঃখ কষ্টের পরিস্থিতি গুলোর সম্পর্কে যখন তিনি কারো নিকট প্রকাশও করতে যান তখন অনেকেই তার কথাগুলো শোনার পর তামাশা তাচ্ছিল্য করে তাকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দেন৷ আবার অনেকেই আছেন, সান্ত্বনা দেবার পরও তাঁরা অন্য কোনো একটি সঠিক পথের সন্ধানটিও করে দেন৷
সৃষ্টিকূলের সর্বোত্তম গবেষক ও অধিক সম্মানের অধিকারিণী কোনো গর্ভধারিণী মা-ই বলতে পারেন না, গর্ভে রাখা সন্তানটি তাঁর কোনো একদিন সে কেমন আকৃতির বেশ নিয়ে এই বিশ্ব ভূমণ্ডলে গর্ভপাত করবে৷
তেমনি এক উদাহরণ স্বরূপ ১-কোটি টাকার প্রসঙ্গে বলতে হয়, স্বপ্নের মাধ্যমে বাস্তব রূপে কখনো ১-কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় না৷ এই ১-কোটি টাকার মালিক হতে হলে বা উপার্জন করতে হলে, দিনে ও রাতে উপবাস থাকার পরেও আরও ২৭টি বৎসর, ৭টি মাস, সাড়ে ৭টি দিন এবং ৭টি ঘন্টা আমাকে তপস্যা করতে হবে৷
যা কোনো একজন মানুষের পক্ষে তাঁর মতো করে বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাটিও অসম্ভাব্যের বিষয়৷ এছাড়া যদিও কোনো একজন সাধারণ ব্যক্তিটির মতোই ক্ষুধা নিবারণ করে দিন ও রাত্রিগুলি অতিবাহিত করতেও যাই, এতেও আমি নিঃসন্দেহে বলবো, ততটা দিন বেঁচেও থাকবো কিনা সেটাও একমাত্র মহান আল্লাহ্ পাক তিনিই সর্বদিক সম্পর্কে ভালো জানেন এবং যেমন তাঁরই দয়ার ইচ্ছা মাত্র৷
হুট করে কোটিপতি হওয়াটা খুব সহজ, তবে সেক্ষেত্রে তাকেও তাঁর সততার পথটি ছেড়ে অসৎ পথের হালটি ধরতে শিখতে হবে৷ অনেকে হয়তোবা এটাও ভালো করে জানেন, পচা তেলেই তেলাপোকারা ভিড় জমায় বেশি৷ তেমনি কিছু পচা তেল কোথাও না কোথাও থেকে পেলে, অনেকেই তা রান্নার কাজে ব্যবহার করে বাকি উদ্বৃত্ত তেলটা পরে তা তাঁরা নিজেদের ময়লা শরীরে মালিশ করে চকচকে সাজেন৷
অথচ মালিশকৃত ব্যক্তিরা তাঁরা এটা কখনো নিজেরাও বুঝতে পারেন না যে, চলতি পথে তাদের শরীর থেকে কী-এক বিশ্রী ধরনের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছেন৷
এই কোটি টাকার প্রসঙ্গটির সম্পর্কে আলোচনাটি করতে হলে আমাকে কিছু আমারই ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস সম্পর্কে ফিরে যেতে হচ্ছে৷ আমি একজন প্রবাসী শ্রমিক মাত্র৷ অপরের কাজকর্ম গুলো সেরে দেওয়াটাই হলো আমার প্রবাসী জীবনের ধর্ম৷ এখানে আমি ‘ধর্ম’ শব্দটির মানে বলতে বুঝিয়েছি, প্রবাসী জীবনের মূল পেশাটিকেই৷
আমার সর্বোচ্চ প্রতি মাসের মাসিক উপার্জিত আয় রোজগার প্রায় ৩০-হাজার টাকার মতো৷ এছাড়াও অন্যান্য অতিরিক্ত নানাবিধ কাজকর্ম গুলো সেরে সেখান থেকেও পেয়ে থাকি প্রায় ২০-থেকে ২২-হাজার টাকার মতো৷ মোটকথা আমার প্রতি মাসের কর্মের উপার্জিত আয় রোজগার বাবদ সবমিলে প্রায় ৫০-হাজার টাকার মতো হয়ে থাকে৷
অনেকেই হয়তো নিজ নিজ মনের গোপনে এটিও ভাবতে পারেন এতগুলো টাকা থাকাটি সত্ত্বেও কেনো আমি উক্ত টাকা, বছর ও দিনগুলির হিসেবের কথাগুলো তুলে ধরেছি? আর যে যাই ভাবুন না কেনো তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু আলোচনা অবশ্যই নিম্নে তা তুলে ধরবো ইনশাহ্ আল্লাহ্৷ যা জানার পরে হয়তোবা অনেকেরই নিজ নিজ মনের ভিতর থেকে ভুল ভাবনাগুলো চিরতরে মুছে যেতে পারে৷
অনেকেই আছে, এই প্রবাস জীবনে বসবাস করাটিকে তাঁরা একদম পছন্দ করেন না৷ তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায়, সমাজের মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাই এই প্রবাস জীবনে কর্ম করার বিষয়টি ভেবে থাকেন৷ আর কেনোই বা শুধুমাত্র বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরাই এই প্রবাস জীবনে কর্মমুখী হোন, এরও কিছু মূল কারণ বা সূত্র রয়েছে৷
এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে হলে অবশ্যই আমাকে একটিবার সেই নব্বই দশকের স্বল্প আয়ের কাজকর্মের পরিস্থিতি গুলোর দিকটায় ফিরে যেতে হচ্ছে৷ হ্যাঁ সেই নব্বই দশকে সমাজের একেকজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা অনেকেই তাঁরা স্বল্প আয়ের কর্মটি করে চলমান জীবন যাপনে নানা রকমের সমস্যায় ভুক্তভোগী হয়েছিলেন৷
তখনকার ঐসময় সেইসব স্বল্প আয়ের রোজগার গুলো দ্বারা কোনভাবেই তাঁরা নিজ নিজ পরিবারের সকল সদস্যদের অভাব অনটনের চাহিদাগুলো সমাধান করতে পারতেন না৷ তখনকার সময়ে সমাজের একেকজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা তাঁরা পারতেন না কোনো একটি রিকশা গ্যারেজে গিয়ে একটা রিকশা ভাড়া নিয়ে রাস্তাঘাটে বের হয়ে একজন রিকশা চালক সেজে যাত্রীদেরকে পারাপার করাবেন৷
কর্ম তো কর্মেই, তাই নয় কি! সেটা ছোট হোক বা বড় হোক তবুও সেটা কর্ম৷ কর্ম করে যারা দিনে আনে দিনে খায়, আমি মনেকরি, তাদের মতো সুখী মানুষ এই পৃথিবীতে আর একজনও নেই৷ আর সেই কর্মটিও যদি হয়ে থাকে সমাজের কোনো একটি মধ্যবিত্ত পরিবার সদস্যদের, তবে সেইক্ষেত্রে আমি বলবো তাঁরাই হলেন এ সমাজে সুখী পরিবার৷
কিন্তু সেই কর্মটাই বা তাঁরা কোথায় পেতো? কে দিবে তাদেরকে তেমনি একটি কর্মের খোঁজ? তাঁরা যে একেকজন রিকশা চালক হিসেবে গ্রাম শহরের পথেঘাটে ভাড়া কাটবেন, সেই রিকশাটাই বা কে এসে তাদেরকে হাতে তুলে দিবেন? তাছাড়া তখনকার ঐসময়ে একটা রিকশা কিনতে গেলেও তো প্রচুর টাকার প্রয়োজন ছিল?
এছাড়া যদিও তাঁরা যেকোনো একটি রিকশা গ্যারেজে গিয়ে গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে ভাড়ায় চালিত একটি রিকশা ভাড়াও চাইতে যেতেন, এতেও যে তাদেরকে নিয়ে গ্যারেজ মালিক সেই মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে নানা কিছু বলাবলি বা ভাবাভাবি করেন নি, সেটিও কিন্তু বলা বাহুল্য?
অবশেষে একটা সময় দেখা যেতো গ্যারেজ মালিকের কাছ থেকে সেই রিকশাটিও তখন আর তাদের কপালে মিলতো না৷ যদিও ভুলবশত কোনক্রমে যেকোনো একটি রিকশা তাঁরা পেয়েও যেতেন, তবে তখনকার সেইসময়ে সেই রিকশা দ্বারা ভাড়া খেটে দৈনিক তাঁরা একশত হতে দেড়শত টাকা উপার্জন করতে পারতেন৷ যা দ্বারা তাঁরা তাদের নিজ নিজ সংসারটি পরিচালনা করতে গিয়ে দৈনিক শতবার হোঁচট খেয়েছিলেন৷
শুধু এই রিকশা চালকের প্রসঙ্গটাই নয়, এরকম ইত্যাদি ইত্যাদি আরও অসংখ্য বিষয় পড়ে রয়েছে যা সমাজের একেকটি মধ্যবিত্ত পরিবার সদস্যদের জন্য ঐসব কাজকর্মগুলি করাটিও তখনকার সময়ে ভীষণ কষ্টসাধ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷
এমবস্থায় পরিবারের সকল সদস্যদের কষ্টের বোঝাটির ভারটা যখন অতিরঞ্জিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিক তখনই তাঁরা তাদের পরিবারের মধ্য থেকে কেউ না কেউ একজন দিশেহারায় অনুরূপ কষ্টের বোঝাগুলোর ভার কমাতে গিয়ে কাঁধে তুলে নিতেন এই প্রবাস জীবনটিকে৷
তবে সত্য এটাই যে, প্রবাসে আসতে পেরে তিনি ছাড়া তাঁর পরিবারের বাকি অন্যান্য সকল সদস্যদের নানাবিধ অভাব অনটনগুলি সহ বিভিন্ন কষ্টের ভারটা অনেকটাই হালকা করতে পেরেছেন৷
কেউ কেউ বলে থাকেন, কোটি টাকা থাকলেই নাকি সুখের বাজারে সুখ কিনতে পাওয়া যায়! উক্ত কথাটির অর্থে আমিও অবশ্য স্বীকার করি তা সত্য৷ তবে এটাও সত্য স্বীকার করি, সেইসব সুখগুলো কখনো চিরদিনের জন্যেও থাকে না৷ তবে যা থাকবে সেটা হলো, সেই কোটি টাকাগুলো যেসব যেসব সৎ কাজকর্মগুলিতে ব্যয় করা হয়েছিল৷
কমবেশি স্বপ্ন যে আমিও দেখি না সেটাও কিন্তু নয়, স্বপ্ন আমিও দেখি৷ তবে সেই কোটি টাকার স্বপ্নটি দেখার অনুভবটিও করি না৷ হ্যাঁ আমিও স্বপ্ন দেখি, যেনো সেই স্বপ্নের বাস্তবিকতায় বাকি জীবনেটা সৎ পথে উপার্জন করে আমি আমার আপনজনদের সাধারণ চাহিদা গুলো যথাসাধ্য পূর্ণ করতে পারি এবং তা সত্ত্বেও যদি সামান্য কিছু টাকা পয়সা অবশিষ্ট থেকে যায়, তবে সেগুলি দিয়ে যেনো সমাজের এতিম পথশিশু ও অসহায়দের দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের বিধিব্যবস্থা করে দিতে পারি৷
কোটি টাকা ব্যয় করেও কখনো জ্ঞান অর্জন করা যায় না৷ জ্ঞানের দোকান খুলে স্বেচ্ছায় জ্ঞান বিক্রি করার জন্য অজস্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই দোকানে বসে থাকেন৷ স্বেচ্ছায় জ্ঞান বিক্রি করাটিই হলো জ্ঞানী ব্যক্তিদের মূল লক্ষ্য৷ যেনো তা অবুঝেরা ঐসব জ্ঞানগুলো ক্রয় করে তারই অবুঝ জ্ঞানটিকে বিকশিত ঘটাতে পারে৷
সব গল্প কবিতার ভাষাগুলোর ভাবার্থ সবাই বুঝতে পারে না৷ কিন্তু যে গল্প কবিতাটি লেখা হয়েছিল সমাজ দর্পণে অথচ তাঁরাও ছিলেন তারই অন্তর্ভুক্ত৷
রচনাকাল: ০৫-০৩-২০২১ইং।
মন্তব্য করুন