ওমানের মৌখিক সাহিত্য কখনো শুধু গল্প বলার মাধ্যম ছিল না। এটি ছিল একটি জীবন্ত স্মৃতি, যা মানুষ ও প্রকৃতির গল্প, জ্ঞান ও আবেগকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে সেই গল্প বলার ধরণও বদলেছে। এখন ওমানের ভিজ্যুয়াল আর্ট, ফটোগ্রাফি ও সিনেমা সেই মৌখিক ঐতিহ্যকে নতুন রূপে তুলে ধরছে।
ওমানের ভিজ্যুয়াল আর্ট এখন শুধু ঐতিহ্যকে নথিভুক্ত করছে না, বরং তাকে জীবন্ত সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে নতুনভাবে তৈরি করছে।
ঐতিহ্যকে নতুন ভাষায় ব্যাখ্যা করছে ভিজ্যুয়াল আর্ট
ওমানি ভিজ্যুয়াল শিল্পী নাইলা হামাদ আল মামারি বলেন, ওমানি শিল্পীরা বাস্তব ও অবাস্তব উভয় ঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন। কাদামাটির ঘর, দুর্গ, টাওয়ার, কারুকাজ করা কাঠের দরজা, সমুদ্র, পাহাড় ও মরুভূমি এখন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা ও মানুষের সংযোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
তার মতে, ঐতিহ্য এখন আর একটি আবদ্ধ অতীত নয়, বরং সমসাময়িক শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে পুনর্ব্যাখ্যা করা একটি গতিশীল উপাদান।
তিনি আরও বলেন, সাংস্কৃতিক পরিচয় আধুনিকতার জন্য বাধা নয়, বরং সৃজনশীলতার উৎস। ওমানি শিল্পীরা অ্যাবস্ট্রাকশন, এক্সপ্রেশনিজম, সুররিয়ালিজম এবং কনসেপচুয়াল আর্টের মতো বৈশ্বিক আন্দোলন থেকে গ্রহণ করেও স্থানীয় প্রতীকগুলো ধরে রেখেছেন।
ফটোগ্রাফিতে মানুষের গল্পই আসল
ফটোগ্রাফার জেয়াদ খালফান আল মাশারি বলেন, শুরু থেকেই তার লক্ষ্য ছিল ওমানি ছবিকে শুধু ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশনের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে স্মৃতি সংরক্ষণ ও গল্প বলার মাধ্যম বানানো।
তিনি বিশ্বাস করেন, ওমানি পরিচয় কেবল ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়, বরং এটি প্রতিদিনের জীবনের মানবিক বিবরণে ভরা — সমুদ্রের লোনা জলে ভেজা জেলের মুখের ভাঁজ, খেজুর গাছের কাণ্ডে রাখা কৃষকের হাত, প্রাচীন গলিতে ছুটে চলা শিশু।
তিনি গল্পের সেবায় আলো, ছায়া, কম্পোজিশন ও রঙ ব্যবহার করেন। তার মতে, একটি সফল ছবি তখনই গল্প বলে, যখন তা দর্শকের কৌতূহল জাগায়।
সিনেমা হয়ে উঠছে লোককথার নতুন মঞ্চ
চলচ্চিত্র নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ আল মালিকি বলেন, ওমানি সিনেমা লোককথাকে মৌখিক বর্ণনা থেকে ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করতে শুরু করেছে, যদিও প্রক্রিয়াটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
খালিদ আল জেদজালির “আল বুম” এর মতো চলচ্চিত্রে সমুদ্রকে শুধু সুন্দর পটভূমি হিসেবে নয়, বরং জীবিকা, অপেক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের স্মৃতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
গল্প কখনো পুরনো হয় না
গল্পকথক থামনা হুবাইস আল জান্দাল বলেন, লোককথা কখনো পুরনো হয় না; এটি নিজেকে নবায়ন করে, প্রতিটি যুগের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়। এটি চাঁদের আলোয়, মজলিসে, রেডিওতে বলা হতো, আর আজ ছবি, সিনেমা, চিত্রকলা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ওমানি গল্পকথক কখনো কেবল বর্ণনাকারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন জনস্মৃতির রক্ষক। আজকের প্রজন্ম ছবির জগতে বাস করে। তাদের নিজেদের ভাষায় সম্বোধন করাই বুদ্ধিমানের কাজ, তবে চেতনা ও পরিচয় হারানোর বিনিময়ে নয়। যদি সহনশীলতা, উদারতা, সাহস ও শিকড়ের প্রতি টানের মতো মূল মূল্যবোধগুলো সংরক্ষিত থাকে, তবে গল্পটি কেবল স্মৃতিতে নয়, হৃদয়েও বেঁচে থাকবে।
মন্তব্য করুন