ওয়ার এন্ড পীস অর্থাৎ যুদ্ধ এবং শান্তি লেভ তলস্তয়ের বিখ্যাত উপন্যাস। বিশাল বিস্তৃত এই উপন্যাস তাঁকে দুনিয়া জোড়া খ্যাতি ও সম্মান এনে দেয়।
এই ঐতিহাসিক মহাউপন্যাসে (১৮৬৬-৬৮) যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ কখনোই মানবকল্যাণের বিষয় হতে পারে না। যুদ্ধ মানুষের শান্তির পরিপন্থী এক বিধ্বংসী কৌশলমাত্র-এই সত্যটি তিনি তুলে ধরেছেন। বিশ্বে হাজারো যুদ্ধ বিরোধী কাহিনী রচিত হয়েছে এবং হচ্ছে, কিন্তু তলস্তয়ের ‘ওয়ার এণ্ড পিস’ এর সমতুল্য সৃষ্টি আজো নির্মাণ হয়নি।
তাঁর অপর দু’টি বিখ্যাত উপন্যাস- আন্না কারেনিনা (১৮৮১-৮২) এবং পুনরুজ্জীবন (১৮৮৯-‘৯৯)। আন্না কারেনিনায় রুশজীবনের গভীর চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। বিশালাকার এই উপন্যাসে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, জীবনের প্রতি অকৃত্রিম দরদ সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
পুনরুজ্জীবন-তলস্তয়ের আর এক অত্যাশ্চর্য সৃষ্টি। অগণন চরিত্র এবং সুবিস্তৃত পটভূমির এই উপন্যাসে মানবজীবনের দুর্দশা, স্বপ্ন, বাঁচার দৃঢ় সংকল্প এবং বহুমাত্রিক জৈবনিক পরিণতির চিত্র লিপিবদ্ধ হয়েছে।
মহাউপন্যাসিক, মহানশিল্পী তলস্তয় জীবন ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মীয়-পরিজন, বিশাল সম্পদ-সম্পত্তি বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করেন নি।
আভিজাত্য, পাহাড় সমান সম্পদ, পরিবার-পরিজন বিসর্জন দিয়ে তিনি শুধুমাত্র মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁকে নানা উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল।
ল. ন. তলস্তয়, লেভ তলস্তয়, তলস্তয় অথবা সাধু তলস্তয় যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন তিনি প্রকৃত অর্থে ছিলেন মানুষ তলস্তয়।
আর মানুষের পাশেই, সাধারণ গরীব-কুলি-মজুরদের পাশেই, এক রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে তাঁর চিরনিদ্রায় শায়িত, নিথর শীতল দেহটি খুঁজে পাওয়া যায়।
ব্যক্তিজীবন উন্নত না হলে মহৎ কোনো সৃষ্টি সম্ভব নয়। জীবন ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় সাধন ভালো শিল্পীর জন্য পয়লা শর্ত। তলস্তয় সে অর্থে যথার্থ শিল্পী। নীতিবাদী দার্শনিক তলস্তয় সত্যসন্ধানী জীবন শিল্পী।
তিনি জন্ম নিয়েছিলেন রাশিয়ার এক অভিজাত পরিবারে। রুশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিটার তাঁর পূর্ব পুরুষকে কাউন্ট খেতাবে ভূষিত করেন। ওয়ারিশসূত্রে তলস্তয় অর্জন করেন বিশাল ভূসম্পত্তি।
কথিত আছে, বাড়ির পাশের জানালার ধারে গাছের শাখায় বসে যে দোয়েল পাখিটি মধুর স্বরে গান গাহিতো সেটিও ছিলো তাঁদের নিজস্ব সম্পদ।
জন্ম নিয়েই তলস্তয় বিশাল প্রাচুর্য আর নিজস্ব সম্পদের চোখ ধাঁধানো স্বরূপ লক্ষ্য করেছেন। তখন রাশিয়ায় ধনী ও নিঃশ্বের মধ্যে চরম বৈরীতা। ভূমিরাজ আর ভূমিদাস। ভূমিরাজদের রক্তচক্ষু আর প্রাচুর্যের অহমিকার স্টিমরোলারের নিষ্পেষণে ভূমিহীন ভূমিদাসরা অসহায়, নিশ্চুপ।
না, ধনকুবেরের অহংকার-তলস্তয়ের মধ্যে থাকতে পারে না। তিনি চান না এই মিথ্যা অহমিকা। তিনি ঘোষণা করেন- ‘দারিদ্র্যের কাছে ঐশ্বর্য মূল্যহীন।’ শুধু তাই নয়, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের সামাজিক সংস্কারের যুগে ভূমিহীন ভূমিদাস চাষীদের মুক্তির জন্য তিনি প্রত্যক্ষ সহায়তায় এগিয়ে আসেন।
১৮৮১-৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘স্বীকারোক্তি’। এ গ্রন্থে তিনি নিজের সামাজিক জীবনকে বর্জন করার কথা ব্যক্ত করেন।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে রুশবিপ্লবের প্রাক্কালে যখন ধনীদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে তলস্তয় তখন অভিজাত বিরোধী বিপ্লবীদের পাশে দাঁড়ান।
রাশিয়ার ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর পক্ষে এবং ধনীকগোষ্ঠীর বিপক্ষ শক্তির বন্ধু তলস্তয় লিখেন-… আমি যা লিখছি তা আজকের শিশুরা পড়বে কুড়ি বছর পরে, আর তা পড়ে হাসবে, কাঁদবে এবং ভালোবাসবে জীবনকে; তাহলে আমার জীবন এবং সব শক্তি তার জন্য উৎসর্গ করতে আমি প্রস্তুত।’
ভ্লাদিমি ইলিচ লেনিন বলেছেন, তলস্তয় যে যুগের মানুষ যা যেমন তার রচনায়, তেমনি তাঁর মতাদর্শে আশ্চর্য সু-প্রকটরূপে প্রতিভাত হয়; আর সেটা হল ১৮৬১ থেকে ১৯০৫ সালের যুগটা।
প্রকৃত অর্থে তলস্তয় জীবনকে ভালোবাসতেন। জীবন সীমাবদ্ধ সময়ের ফ্রেমে বাঁধা, কিন্তু এই ছোট্ট জীবন অনেক বড় ও সুন্দর হতে পারে যদি সে জীবন হয় অর্থবহ এবং সুন্দর।
মানবজীবনের কল্যাণই ছিলো তলস্তয়ের একান্ত কাম্য। আর এজন্য তিনি তাঁর সমস্ত লেখক জীবনে মানবকল্যাণে শান্তির বাণী উচ্চারিত হয়েছে নানাভাবে।
১৮২৮ থেকে ১৯১০ -এই বিরাশি বছরের সীমাবদ্ধ জীবন ছিলো তাঁর। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির সীমারেখা বহু বহু গুণ দীর্ঘ ও বিস্তৃত।
সম্পাদনায়:
-হুমায়ুন কবির চৌধুরী
মন্তব্য করুন