বিশ্বাস সেই সম্পদ জর্দা খান কবিদের মনমানসিকতা ও সমালোচনার সংস্কৃতি প্রেমের প্রস্তাব ফেরানোয় রাবি ছাত্রীকে অস্ত্রের ভয় ও হুমকির অভিযোগ ওয়ার এন্ড পীস -[প্রসঙ্গ কথা] অভিমান, ৫ম খন্ড পর্যন্ত মানুষ কে? বুনো হাঁস মেঘনাদবধ-[২য় সর্গ-০২] মেঘনাদবধ-[২য় সর্গ-০১]
LIVE
দৈনিক চালচিত্র | dailychalchitra.com
ছোট গল্প

বিশ্বাস সেই সম্পদ

লেখক: মাইন উদ্দিন

প্রকাশ: 30 July, 2026, 02:29 PM

কোন একদিন এক বৃদ্ধ দাদা তাঁর প্রিয় নাতিকে বললেন,

দাদা: শোন্ নাতি ভাই তোকে একটা কথা বলি, জীবনে বেঁচে থাকতে হলে এই জগৎ-এ কোন্ মানুষটার স্বভাব চরিত্র কেমন তা তোকে অবশ্যই চিনতে হবে।

নাতি: এই জগৎ-এ অগণিত মানুষের ভিড়ে কোন্ মানুষটা কেমন আমি তা কিভাবে চিনবো দাদু? তাছাড়া মানুষ চিনতেও তো বছরের পর বছর লাগে?

দাদা: এইযে আবারও তুই ভুল বললি নাতি ভাই, আজকালকার জামানায় এখন কী আর মানুষকে চিনতে বছরের পর বছর লাগে রে পাগলা? বরং একদিনও লাগে না বুঝলি! শুধু এই একটি কথাই সবসময় মনে রাখবি, এখনকার যুগে একজন মানুষের মুখের ভাষা ও তাঁর চালচলন দেখেই তুই আংশিক অনুমান করে নিতে পারবি যে… আসলেই সে কোন্ ধরনের মানুষ এবং তার স্বভাব চরিত্র কেমন!

দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে নাতি ফের জিজ্ঞেস করল।

নাতি: তা নয় হয় বুঝলাম দাদু, কিন্তু তুমি আমাকে এই কথাটি শুধু একটু বুঝিয়ে বলো যে.. একজন মানুষের মুখের ভাষা শুনে আমি তাকে কীভাবে চিনবো যে আসলেই সে-কী মানুষ নাকি অমানুষ?

নাতির এমন কথাটি শোনার পরই দাদা মুচকি হেসে বললেন,

দাদা: খুব শীঘ্রই নিজের চোখেই তা তুই দেখতে পারবি।

নাতি: সেটা কিভাবে?

দাদা: শোন্ তাহলে তোকে একটি ঘটনার কথা বলি, এক গ্রামে একজন ব্যক্তি ছিলেন, গ্রামের সবার সঙ্গেই তিনি হাসিমুখে কথা বলতেন, অন্যান্য সকল লোকজনের খোঁজখবর রাখতেন। কার ঘরে কী সমস্যা রয়েছে এবং কোন্ বিষয়ের উপর কার সঙ্গে কার কোন্ মনোমালিন্য রয়েছে তা তিনি জেনেশুনে এরপর সমাধান করার চেষ্টা করতেন।
ওনার এমন উদার মনমানসিকতা দেখে, গ্রামের প্রত্যেক লোকজনেরাই ভাবত…মানুষটা আসলে কতই না ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের!

নাতি: তারপর কি হলো?

দাদা: তারপর, একদিন আমি সেই গ্রামের একটি আনুষ্ঠানিক সমাগমে উপস্থিত হয়ে বললাম…“শুনুন আপনারা যাকে ভালো মানুষ বলে জানেন বা চেনেন, সত্যিকার্থে আদৌ কী তিনি ভালো মানুষ কিনা সে ব্যাপারে আমি তাহার কিছু একটা পরীক্ষা নিতে চাই। সেইক্ষেত্রে আপনাদের মধ্য থেকে কেউ একজন ওনার কাছে গিয়ে বলেন যে আমি তাকে ডেকেছি।”

কেননা আমি শুধু এটাই জানতাম যে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কখনো তাঁর চেহারা দেখে নির্ণয় করা যায় না, বরং কথার আমানতেই তাহার আসল পরিচয় পাওয়া যায়।

আমার আদেশ শুনে গ্রামের কেউ একজন সেই ব্যক্তিটিকে আমার কাছে ডেকে আনলেন। এরপর আমি তাকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে কিছু মিথ্যে কথা বানিয়ে বলেছিলাম এবং সেই মিথ্যে কথাগুলো বলার পরে তাকে আমি একথাটিও অনুরোধ করে বলেছিলাম যে…

“দেখুন, আপনাকে আমি এইমাত্র যেসব কথাগুলো বললাম সেগুলি যেন অন্য আর কেউ শুনতে বা জানতে না পায়।”

এরপর আমার এমন অনুরোধ বিশেষ্য কথাগুলো শোনার পর নিজের বুকে নিজেই তিনি হাত রেখে পরে জবাব দিলেন।

“আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আপনার কথাগুলো আমি এ-জীবনে অন্য আর কারো কাছে প্রকাশ করবো না।”

এরপর লোকটির এমন ওয়াদা মূলক কথার জবাবটা শুনে আমি আনমনে একটুখানি হাসলামও বটে, এরপর শেষে তাকে আমি বললাম..

“আচ্ছা ঠিক আছে, আপনি তাহলে এখন আসতে পারেন।”

এ কথাটি বলার পরেক্ষণেই তিনি তখন তার গন্তব্যে চলে গেলেন আর অন্যদিকে আমি সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পরে সেখান চলে আসলাম বাড়িতে। এরপর কি ঘটেছিল শুনবি?

নাতি: কী ঘটেছিল?

দাদা: সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল যেটি, তা হলো সেদিন আমি যেসব মিথ্যে কথাগুলো ঐ লোকটিকে বানিয়ে বলেছিলাম ঐসব কথাগুলো মাত্র ১-২ ঘন্টার মধ্যেই তা আবার আমার কানেই ফিরে এসেছিল। শুধু সেই মিথ্যে কথাগুলিই নয় বরং তার সঙ্গে আরও কিছু উদ্ভট মিথ্যে কথাও তিনি যোগ করেছিল। এরপর সেই কথাগুলোর উৎস ধরেই সাজিয়েছিল নতুন আরেক মিথ্যে গল্প। সেই গল্পে এমন কথাটিও তুলে ধরেছিল যে- যা আমি তাকে সেদিন বলেই নি। এরপর কী হয়েছিল শুনবি?

নাতি: কি হয়েছিল?

দাদা: এর পরের দিন সেই লোকটাই আবার আমার সামনে এসে হাজির হলেন। মুখে ছিল তাঁর হাসিখুসি ভাব, এসেই সালাম জানিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

ব্যক্তি: “আসছালামু আলাইকুম।
কেমন আছেন ভাই?”

আমি তাঁর সালামের উত্তর দিলাম। এরপর তার দিকে আমি এক নজর তাকিয়ে ভারভার গলায় তাকে বললাম,

দাদা: “আলহামদু লিল্লাহ্, এই তো ভালো। তো আপনি কেমন আছেন?”

ব্যক্তি: “জ্বী আমিও ভালো আছি।”

দাদা: “তারপর বলুন- হঠাৎ কী মনে করে এলেন?”

ব্যক্তি: “না, কিছু মনে করে আসেনি, এমনিতেই এই পথে ধরে একটু যাচ্ছিলাম, এরই মধ্যে আপনাকে দেখে থেমে গেলাম।”

দাদা: “ও আচ্ছা। যাই হোক আপনাকে আমি একটি কথা বলবো বলবো করে কথাটি আর আপনাকে বলার সুযোগই পাইনা! তো আপনি কী এখন খুব ব্যস্ত?”

ব্যক্তি: “না, ব্যস্ত নই, বলুন কী কথা বলবেন!”

দাদা: “কথাটি হলো এই- গতকাল আপনাকে আমি যেসব কথাগুলো বলেছিলাম আপনি কী তা জানেন- কথাগুলো ছিল সবেই মিথ্যে? আর কথাগুলো আমি বলেছিলাম শুধুমাত্র আপনাকে পরীক্ষা করার জন্য। অর্থাৎ ঐ মিথ্যে কথাগুলো ছিল একটি তালা সমতুল্য, আর সেই তালার চাবিটি ছিল স্বয়ং আপনি। যা আপনাকে আমি আমানত হিসেবে হাতে তুলে দিয়েছিলাম, আর আপনাকে আমি একথাটিও বলেছিলাম যে তালাটি যেন কখনোই খোলা না হয়। অথচ আপনি কী করলেন… সেটি মাত্র দুয়েক ঘন্টার মধ্যেই তা খুলে ফেললেন।”

লোকটি তখন আমার কথাগুলো শোনার পর খিট্‌খিট্‌ করে হাসছিলেন। পরে আমি আবারও তাকে বললাম,

দাদা: “দেখুন আমি আপনাকে এমন কোন গোপনীয় কথাটিও বলিনি।
বরং গতকাল আপনাকে যে কথাগুলো বলেছিলাম তা হতে এটাই আমি পরিষ্কার জানতে চেয়েছিলাম যে, দেখি, এই মিথ্যে কথাগুলো আপনি কতক্ষণ তা গোপন করে ধরে রাখতে পারেন, নাকি সেগুলি পথেঘাটে বিক্রি করে দেন! আর আপনি সেটাই করেছেন।

শুনুন, আপনাকে আমি আরও একটি কথা বলে রাখি,
মানুষের ছোট-খাট ভুলগুলো কিন্তু ক্ষমা করা যায়। তবে যে মানুষেরা বিশ্বাসকে বাজারের পণ্য বলে মনে করেন, সেই মানুষদের হাতে নিজের ঘরের চাবিটা কখনোই তুলে দিতে নেই।
আর দেখুন, টুকরো কাঁচ কিন্তু ঠিকই জোড়া লাগানো যায়, তবে বিশ্বাস যদি একবার ভেঙে যায় তা কিন্তু আর জোড়া লাগানো সম্ভব নয়।”

সেদিনের পর থেকে আমি কোনদিন আর সেই লোকটিকে এমন কাঠগড়ায় দাঁড় করাইনি এবং কোন ধরনের কথাও বলিনি। শুধু নিজের ব্যক্তিগত কথাগুলোর দরজাটায় চিরদিনের জন্য একটি তালা মেরে রেখেছি। কেননা আমি জানতাম,

অনেকেই বন্ধু সেজে পাশে থাকার অভিনয় করে, আর সেটা তাঁদের শুধু নিজের স্বার্থের জন্য। আর এরাই সেইসব মানুষ যারা কিনা মানুষের দুঃখকষ্টের কথাগুলো ঠিকই শোনে তবে সহানুভূতির জন্য নয়, বরং অহেতুক কিছু মিথ্যে সাজানো গল্প বানিয়ে সমাজের কাছে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে শুনে থাকে। আর এমন মানুষরাই যখন তাঁর নিজের মুখের ভাষায় নিজেরই পরিচয় দিয়ে দেয়, তখন আর তাদেরকে ঘিরে তর্কবিতর্ক করারও প্রয়োজন পড়ে না।

দাদা: তাই বলি কী শোন্ নাতি ভাই, তোকেও আমি এই একটি কথাই বারবার বলে রাখছি শোন্- বিশ্বাস এমন এক সম্পদ, যা একবার যদি হারিয়ে ফেলিস তবে তা আর কোনদিনও ফিরিয়ে আনতে পারবি না। তাই দুঃখ, কষ্ট কিংবা এমন কোন গোপনীয় কথাও যদি তোর থেকে থাকে তবে সেগুলি তুই এই ধরনের মানুষদের কাছে কখনই বলবি না। হ্যাঁ বলবি তবে ঐসব মানুষদেরকে- যারা কিনা তোর সব কথাগুলো বিশ্বাস ও মর্যাদার সহিত ধরে রাখতে পারবে শুধু তাদেরকেই বলবি!

নাতি: আচ্ছা ঠিক আছে দাদু।


রচনাকাল: ২৯-০৭-২০২৬ইং।

0 বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করছেন অতিথি পাঠক হিসেবে — নিজের নাম দিয়ে যুক্ত হতে চান?
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

নতুন একাউন্ট তৈরি করুন

আগেই একাউন্ট আছে? লগ ইন করুন
আরও পড়ুন নতুন পোস্ট পুরোনো পোস্ট
দৈনিক চালচিত্র
লেখক তালিকা
চাকরির বিজ্ঞপ্তি
অন্যান্য