ওয়ার এন্ড পীস -[প্রথম খণ্ড, অধ্যায়-২] ফেসবুক ফলোয়ার ওয়ার এন্ড পীস -[প্রথম খণ্ড, অধ্যায়-১] বিশ্বাস সেই সম্পদ জর্দা খান কবিদের মনমানসিকতা ও সমালোচনার সংস্কৃতি প্রেমের প্রস্তাব ফেরানোয় রাবি ছাত্রীকে অস্ত্রের ভয় ও হুমকির অভিযোগ ওয়ার এন্ড পীস -[প্রসঙ্গ কথা] অভিমান, ৫ম খন্ড পর্যন্ত মানুষ কে?
LIVE
দৈনিক চালচিত্র | dailychalchitra.com
ঐতিহাসিক মহাউপন্যাস

ওয়ার এন্ড পীস -[প্রথম খণ্ড, অধ্যায়-২]

লেখক: লিও তলস্তয়

প্রকাশ: 05 August, 2026, 01:43 PM

আন্না পাভলভনার বৈঠকখানা ক্রমেই লোকজনে ভরে উঠছে। পিতার্সবুর্গের একেবারে উঁচু মহলটাই সেখানে হাজির : সমবেত লোকজনের মধ্যে বয়স ও চরিত্রের ফারাক বিস্তর, কিন্তু সামাজিক মর্যাদায় সকলেই এক। প্রিন্স ভাসিলির মেয়ে সুন্দরী হেলেন এসেছে তার বাবাকে দূতাবাসের অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে; তার পরনে বলনাচের পোশাক, তাতে প্রধান অতিথির তকমা আঁটা। পিতার্সবুর্গের সব চাইতে মনোরমা তরুণী প্রিন্সে বলকনস্কায়াও এসেছে। গত শীতকালে তার বিয়ে হয়েছে; সন্তান-সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় সে আজকাল বড় জমায়েতে যায় না, শুধু ছোটখাট অনুষ্ঠানেই যোগ দেয়। প্রিন্স ভাসিলির ছেলে হিপোলিৎ এসেছে মর্তেমার্ৎকে সঙ্গে নিয়ে; তাকে সে সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। মঠাধ্যক্ষ মোরিও এবং আরও অনেকেই এসেছে।

নতুন কেউ এলেই আন্না পাভলভনা তাকে বলছে, “আমার মাসির সঙ্গে তো আপনার এখনও দেখাই হয়নি,” অথবা “আমার মাসিকে কি আপনি চেনেন না?” আর খুব গম্ভীর হয়ে তাকে সেই বৃদ্ধ মহিলাটির কাছে নিয়ে হাজির করছে। টুপিতে মস্তবড় একটা ফিতের “বো” পরে মহিলাটি ঘরের মধ্যে বসে আছে; ধীরে ধীরে প্রতিটি অতিথির নাম ঘোষণা করেই আন্না পাভলভনা সেখান থেকে চলে যাচ্ছে।

অতিথিরা কেউই এই বুড়ি মাসিটিকে চেনে না, চিনতে চায় না, তাকে নিয়ে মাথাও ঘামায় না; তবু প্রত্যেকেই তাকে সাদর সম্ভাষণ জানাচ্ছে, আর আন্না পাভলভনা নীরবে, বিষণ্ণ আগ্রহের সঙ্গে সেটা লক্ষ্য করছে। মাসিও প্রত্যেকের সঙ্গেই সেই একই কথা বলছে, সেই একই পারস্পরিক স্বাস্থ্যের কথা, আর মহামান্যা সম্রাজ্ঞীর স্বাস্থ্যের কথা, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আজ তিনি অনেকটা ভাল আছেন।” ভদ্রতার খাতিরে বিরক্তি প্রকাশ থেকে বিরত থাকলেও সকলেই এই বিরক্তিকর কর্তব্যটি পালন করে সেখান থেকে সরে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচছে এবং সারা সন্ধ্যা আর সে জায়গা মাড়াচ্ছে না।

তরুণী প্রিন্সেস বলকনস্কায়া জরির কাজ-করা ভেলভেটের থলেতে কিছু কাজের নমুনা নিয়ে এসেছে। তার সুন্দর ছোট ঠোঁটের উপরে ঈষৎ গোঁফের রেখা চোখে পড়ছে; ঠোঁটটি দাঁতের তুলনায় কিছুটা ছোট হলেও তাতেই তাকে সুন্দর মানিয়েছে; বিশেষ করে দুটো ঠোঁট যখন মাঝে মাঝে মিলে যায় তখন তাকে বড়ই সুন্দর দেখায়। অন্য সব মনোরমা স্ত্রীর মতোই তার এই ত্রুটি-উপরের ঠোঁট ছোট হওয়ার জন্য মুখটা অর্ধেক খুলে থাকা-এই ত্রুটিই যেন তার পক্ষে একটি বিশেষ সৌন্দর্যের লক্ষণ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই সুন্দরী তরুণীটিকে দেখে সকলের মুখই জ্বলজ্বল্ করে উঠল-শীঘ্রই তো সে মা হবে, অথচ কেমন প্রাণ-শক্তি ও স্বাস্থ্যে ভরপুর, কেমন অনায়াসে এই ভার সে বহন করে চলেছে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালে, তার সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বললে বৃদ্ধ ও মন-মরা যুবকরাও মনে করে তারাও বুঝি তার মতোই জীবন ও স্বাস্থ্যে ভরপুর হয়ে উঠেছে। যারাই তার সঙ্গে কথা বলে, প্রতিটি কথার পরে তার উচ্ছল হাসি ও সাদা দাঁতের ঝলকানি দেখতে পায়, তারাই মনে করে যে সে দিনটাতে তাদের মন-মেজাজও ভালো হয়ে উঠেছে।

ছোট্ট প্রিন্সেসটি হাল্কা অথচ দ্রুত পা ফেলে ফেলে কাজের থলেটা হাতে ঝুলিয়ে টেবিলের চারদিকে পাক খেয়ে সুন্দরভাবে পোশাকটা ছড়িয়ে রুপোর সামোভারটার পাশে একটা সোফায় এমনভাবে বসল যেন সে যা কিছু করছে তাতে যেমন সে নিজে, তেমনই অন্য সকলেই খুব খুশি। থলের জিনিসগুলি বের করে সকলকে ডেকে সে ফরাসীতে বলল, “আমার কাজগুলি নিয়েই এসেছি। দেখুন আন্নেৎ, আশা করি আমার সঙ্গে আপনি ইয়ারর্কি করেননি। চিঠিতে লিখেছিলেন, নেহাৎই ছোটখাট অনুষ্ঠান হবে, আর তাই দেখতেই পাচ্ছেন কী রকম বাজে পোশাক পরে আমি এসেছি।”

আন্না পাভলভনা জবাব দিল, “যাই পর না কেন তবু তুমি অন্য সকলের চাইতে সুন্দরী।”

জনৈক জেনারেলের দিকে ফিরে সেই একই সুরে প্রিন্সেস ফরাসীতেই বলল, “আপনি কি জানেন যে আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে? সে তো যাচ্ছে নিজেকে খুন করতে। আপনিই বলুন, এই হতভাগা যুদ্ধে কি লাভ?” প্রিন্স ভাসিলির দিকে ঘুরে সে জিজ্ঞাসা করল; তারপর জবাবের জন্য অপেক্ষা না করেই সে তার মেয়ে সুন্দরী হেলেনের দিকে মুখ ফেরাল।

প্রিন্স ভাসিলি আন্না পাভলভনাকে বলল, “এই ছোট প্রিন্সেসটি কী মিষ্টি!”

তার পরেই এসে হাজির হলো মজবুত গড়নের একটি শক্ত-সমর্থ যুবক। চুল ছোট করে ছাঁটা, চোখে চশমা, পরনে হাল্কা রঙের কেতাদুরস্ত ব্রীচেস ও বাদামী ড্রেস-কোট। এই যুবকটি ক্যাথারিনের সমকালীন বিখ্যাত জমিদার কাউন্ট বেজুকভ-এর অবৈধ সন্তান। জমিদারবাবুটি এখন মুমূর্ষু অবস্থায় মস্কোতে দিন কাটাচ্ছে। যুবকটি এখনও সামরিক বা বেসামরিক কোনও চাকরিতেই যোগ দেয়নি, কারণ এই সবেমাত্র সে বিদেশ থেকে ফিরেছে; বিদেশেই সে লেখাপড়া শিখেছে; এখানকার সমাজে এই তার প্রথম আবির্ভাব। বৈঠকখানার নিম্নতর মর্যাদার অধিকারী লোকের মতোই মাত্র একটুখানি ঘাড় নেড়েই আন্না পাভলভনা তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু এই নিচু মনের অভ্যর্থনা সত্ত্বেও পিয়েরকে ঘরে ঢুকতে দেখেই মহিলাটির মুখের উপর উদ্বেগ ও আতঙ্কের এমন একটা ছায়া নেমে এল যেন সেই মানুষটি এই ঘরের তুলনায় অনেক বড়, যেন এ ঘরে তাকে মানায় না। ঘরে সমবেত অন্য সকলের চাইতে এই যুবকটির চেহারা অবশ্যই বড় মাপের; কিন্তু মহিলাটির উদ্বেগের কারণ অন্য; যুবকটির মুখের ভাব লাজুক অথচ সপ্রতিভ, কিন্তু পর্যবেক্ষণশীল ও স্বাভাবিক ভাবটিই তাকে বৈঠকখানার অন্য সকলের চাইতে বিশিষ্ট করে তুলেছে।

যুবকটিকে মাসির কাছে নিয়ে যেতে যেতে তার সঙ্গে শঙ্কিত দৃষ্টি-বিনিময় করে আন্না পাভলভনা বলল, “মঁসিয় পিয়ের যে একটি অসহায় পঙ্গু মানুষকে দেখতে এখানে এসেছেন তাতে ভারী খুশি হয়েছি।”

যেন কাউকে খুঁজছে এমনিভাবে চারদিকে তাকাতে তাকাতে পিয়ের বিড় বিড় করে কি যে বলল কিছুই বোঝা গেল না। মাসির কাছে যেতে যেতেই সে স্মিত হাসি হেসে মাথা নিচু করে ছোট প্রিন্সেসকে অভিবাদন জানাল; যেন তার সঙ্গে পরিচয়টা বেশ ঘনিষ্ঠ।

আন্না পাভলভনার ভয়টা অকারণ নয়; মহামান্যা সম্রাজ্ঞীর স্বাস্থ্য সম্পর্কে মাসি যে লম্বা বক্তৃতা দিল তার কোনও জবাব না দিয়েই পিয়ের তার দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। আন্না পাভলভনা তাকে আটকে দিয়ে সভয়ে বলে উঠল:

“আপনি কি মঠাধ্যক্ষ মোরিওকে চেনেন? খুব আমুদে মানুষ।”

“হ্যাঁ, তাঁর শাশ্বত শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা আমি শুনেছি; পরিকল্পনাটি আকর্ষণীয়, কিন্তু মোটেই সম্ভবপর নয়।”..

গৃহকর্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থেকেও আন্না পাভলভনা কোনও রকমে জবাব দিল, “আপনি তাই মনে করেন বুঝি?” পিয়ের কিন্তু এবার ভদ্রতাবিরুদ্ধ কাজ করে বসল। প্রথমে এক মহিলার কথা শেষ হবার আগেই তার কাছ থেকে চলে এসেছিল, আর এখন যে চলে যেতে চাইছে তাকে ধরে কথা শোনাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাথা নুইয়ে দুই পা ছড়িয়ে সে বোঝাতে শুরু করে দিল কেন সে আবে-র পরিকল্পনাকে অলীকে কল্পনাবিলাস বলে মনে করে।

আন্না পাভলভনা হেসে বলল, “এ নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।”

যুবকটির হাত থেকে ছাড়া পেয়ে সে আবার গৃহকর্ত্রীর কর্তব্য পালনে তৎপর হয়ে উঠল। সব দিকে তার চোখ, সর্বত্র তার কান; যেখানেই আলোচনায় ঢিল পড়ছে সেখানেই সে বাড়িয়ে দিচ্ছে তার সাহায্যের হাত। সুতো-কলের ফোরম্যান যেমন কারখানার কাজ চালু করে দিয়ে চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখে-কোথায় একটা টেকো থেমে গেছে, বা ক্যাঁচ-ক্যাঁচ করছে, অথবা যতটা শব্দ হওয়া উচিত তার চাইতে বেশি শব্দ করছে, এবং সেখানেই ছুটে গিয়ে যন্ত্রটা পরীক্ষা করে দেখে বা ঠিক মতো চলিয়ে দেয়, ঠিক তেমনই আন্না পাভলভনাও বৈঠকখানায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখনও বা নীরব, আবার কখনও অতিমাত্রায় সরব কোনও দলের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং একটা মুখের কথায় অথবা ব্যবস্থার সামান্য রদ-বদল করে আলোচনার যন্ত্রটাকে আবার যথাযথভাবে চালু করে তুলছে। কিন্তু এসব কাজকর্মের মধ্যেও পিয়েরকে নিয়ে তার উদ্বেগটা বেশ স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠছে। পিয়ের যখনই মর্তেমার্ৎ-এর দলের কাছে অথবা মঠাধ্যক্ষের দলের কাছে যাচ্ছে তখনই মহিলাটি তার উপর কড়া নজর রাখছে।

পিয়ের লেখা-পড়া শিখেছে বিদেশে; রাশিয়াতে এসে আন্না পাভলভনার পার্টিতেই সে প্রথম যোগ দিল। সে জানত, পিতার্সবুর্গের সেরা সব গুণীজনরাই সেখানে হাজির থাকবে, তার খেলনার দোকানে কৌতূহলী শিশুর মতো কোন দিক রেখে কোন দিকে যে তাকাবে তাই ঠিক বুঝতে পারছে না, মনে ভয় পাচ্ছে কোন কুশলী আলোচনা ও মন্তব্য না অশ্রুত থেকে যায়। সমবেত সকলের মুখে যে আত্মবিশ্বাস ও সুষ্ঠু অভিব্যক্তি তার চোখে পড়েছে তাতে সর্বক্ষণই একটা গম্ভীর কিছু শুনবার আশাই সে করছে। শেষ পর্যন্ত সে মোরিওর কাছে গিয়ে হাজির হলো। সেখানকার আলোচনাটা তার বেশ মনোগ্রাহী বলে মনে হলো; তাই অন্য সব যুবকদের মতোই সেও তার নিজের মত প্রকাশ করবার মতো একটা সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।


(চলমান….)

0 বার দেখা হয়েছে

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করছেন অতিথি পাঠক হিসেবে — নিজের নাম দিয়ে যুক্ত হতে চান?
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

নতুন একাউন্ট তৈরি করুন

আগেই একাউন্ট আছে? লগ ইন করুন
আরও পড়ুন নতুন পোস্ট পুরোনো পোস্ট
দৈনিক চালচিত্র
লেখক তালিকা
চাকরির বিজ্ঞপ্তি
অন্যান্য